জীবিতকালে মানুষ নানা পরিচয়, ধর্ম আর বিশ্বাসে বিভক্ত থাকে। কিন্তু মৃত্যুর পর সেই পরিচয়ের দূরত্ব যেন অনেকটাই স্তব্ধ হয়ে যায়। এর এক অনন্য নজির দেখা যায় গাজীপুরের মনিপুর এলাকায় অবস্থিত ‘বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে’র কবরস্থানে। একই প্রাঙ্গনের সীমানার ভেতরে পাশাপাশি শুয়ে আছেন বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ, যাদের কেউ মুসলমান, কেউ হিন্দু, কেউবা খ্রিষ্টান।
প্রায় ৭২ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটি শুধু প্রবীণদের শেষ অধ্যায়ের আশ্রয়স্থলই নয়, এটি জীবন ও মৃত্যুর মধ্যকার এক নীরব সত্যের সাক্ষী।
প্রতিষ্ঠানটির কবরগুলোর দিকে তাকালে চোখে পড়ে সময়ের নানা ছাপ। কোথাও পুরোনো কবরের চিহ্ন মলিন, কোথাও নতুন মাটির স্তূপ। বড় বড় গাছের ছায়ায় সারি সারি কবর। কিন্তু এই নীরবতার মধ্যেও আলাদা হয়ে আছে ধর্মীয় পরিচয়ের কিছু চিহ্ন।
কারণ, মৃত্যুর পর শেষ ঠিকানা একই প্রাঙ্গণ হলেও শেষ বিদায়ের নিয়ম এক নয়।
মুসলমানদের দাফন করা হয় ইসলামী রীতি অনুযায়ী। হিন্দু, খ্রিষ্টানসহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও অনুসরণ করা হয় তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় নিয়ম। অর্থাৎ শেষ আশ্রয়ের জায়গাটি একই হলেও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যটুকু রাখা হয় মৃত্যুর পরও।
১৯৮৭ সালে ভাড়া বাড়িতে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটির। পরে ১৯৯৪ সালে এটি গাজীপুরের মনিপুর এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে কেন্দ্রে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন প্রবীণ বসবাস করছেন। প্রতিষ্ঠানটির মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ২০০ জন।
এখানে ধর্মীয় পরিচয় কারও বসবাসের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না; বরং মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ মিলেমিশে এক মানবিক বন্ধনে বসবাস করেন। প্রত্যেকে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী প্রার্থনা ও উপাসনা করেন।
একজন অসুস্থ হলে অন্যজন খোঁজ নেন। কারও মন খারাপ হলে পাশে বসেন আরেকজন। ধর্মীয় উৎসব এলে ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষও ভাগাভাগি করে নেন আনন্দ।
রক্তের সম্পর্কের বাইরে বয়সের শেষ প্রান্তে এসে এভাবেই তৈরি হয় এক ধরনের মানবিক সম্পর্ক।
এই কেন্দ্রের বাসিন্দাদের অনেকের জীবনে পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কারও আপনজন নেই, কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, আবার কেউ শেষ বয়সেও আর পরিবারের কাছে ফিরতে পারেননি।
তাদের কেউ মারা গেলে প্রথমে খবর দেওয়া হয় স্বজনদের। পরিবার মরদেহ নিতে চাইলে তা তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু স্বজনেরা না নিলে কিংবা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় শেষকৃত্য সম্পন্ন করার প্রয়োজন হলে ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করেই ব্যবস্থা করা হয়।
প্রায় ৩০ বছরে এই কবরস্থানে প্রায় দুই হাজার মানুষকে সমাহিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অর্থাৎ, যাদের জীবনের শেষ সময়ে আপনজনের উপস্থিতি অনিশ্চিত ছিল, মৃত্যুর পর তাদের জন্যও একটি নির্দিষ্ট জায়গা ছিল-এই কবরস্থান।
কবরস্থানে ঢুকতেই চোখে পড়ে একটি বড় সাইনবোর্ড। সেখানে উল্লেখ রয়েছে-এটি মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কবরস্থান।
ভেতরে বড় বড় গাছেও রয়েছে সম্প্রদায়ভিত্তিক পরিচয়ের সাইনবোর্ড। কোথাও লেখা-‘গোরস্থান মুসলমানদের জন্য’, কোথাও ‘হিন্দুদের জন্য’।
আছে মুসলমানদের জানাজা পড়ার স্থান। পাশাপাশি হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মৃতদেহের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
অর্থাৎ, একই সীমানার মধ্যে থেকেও শেষ বিদায়ের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের ধর্মীয় পরিচয়কে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কেন্দ্রের বাসিন্দা সাবিনা বলেন, “কেউ মারা গেলে স্বজনদের খবর দেওয়া হয়। যারা মরদেহ নিয়ে যেতে চায়, নিয়ে যায়। যেসব হিন্দুকে তাদের স্বজনেরা নিয়ে গিয়ে দাহ করতে পারেন, তারা নিয়ে যান। না হলে এখানে ব্যবস্থা করা হয়। একই জায়গায় সমাহিত করা হলেও ধর্ম অনুযায়ী ভাগ করা আছে।”
আরেক বাসিন্দা মনোয়ারা বলেন, “যাদের কেউ নেই, তাদের এখানেই কবর দেওয়া হয়। আমাদের এখানে সবার কবর একই জায়গায়। মুসলমানদের জানাজা পড়িয়ে কবর দেওয়া হয়। অন্য ধর্মের মানুষদের তাদের নিয়ম অনুযায়ী সমাহিত করা হয়।”
বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের হোস্টেল সুপার হাবিবা খন্দকার প্রায় ৩০ বছর ধরে এখানে কর্মরত। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি দেখেছেন বহু মানুষের আগমন, বার্ধক্য, অসুস্থতা এবং শেষ বিদায়।
তিনি বলেন, “আমাদের এখানে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান সবাইকেই সমাহিত করা হয়। এখানে কেউ মারা গেলে প্রথমে আত্মীয়-স্বজনকে জানানো হয়। কেউ নিয়ে যেতে চাইলে তারা নিয়ে যেতে পারেন। যদি না নেন, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী সমাহিত করা হয়।”
হাবিবা খন্দকার আরও বলেন, “হিন্দুরা মারা গেলে হিন্দুদের দিয়েই তাদের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হয়। খ্রিষ্টানদের মৃত্যুর পর যে নিয়ম আছে, সেই নিয়ম মেনেই ব্যবস্থা করা হয়। আমি এখানে প্রায় ৩০ বছর ধরে কর্মরত। মৃত্যুর পর আমরাই তাদের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করে থাকি। এই কবরস্থানে প্রায় দুই হাজারের মতো মানুষকে সমাহিত করা হয়েছে।”
জীবনের শুরুতে মানুষ পরিচিত হয় পরিবার, সমাজ, ধর্ম ও নানা পরিচয়ে। সময়ের সঙ্গে সেই পরিচয়ের চারপাশে তৈরি হয় অসংখ্য বিভাজনও।
কিন্তু গাজীপুরের মনিপুরের এই কবরস্থান যেন নীরবে মনে করিয়ে দেয়- জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো তার মানুষ হওয়াই।
এখানে পাশাপাশি রয়েছে ভিন্ন ধর্মে জন্ম নেওয়া মানুষের শেষ ঠিকানা। শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা আলাদা, বিশ্বাস আলাদা; কিন্তু আশ্রয়ের সীমানা এক।
একই সীমানায় মুসলিম-হিন্দু-খ্রিষ্টানের শেষ ঠিকানা









